২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ১৩ দফা দাবি তুলে রাজপথে আলোড়ন সৃষ্টি করা হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এবার বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দিয়েছে ৯ দফা দাবি। দাবির সংখ্যা কমলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, সংগঠনটির দীর্ঘদিনের ধর্মীয় অবস্থানের বড় অংশই বহাল রয়েছে; পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু দাবি, বিশেষ করে বিচার ও কওমি শিক্ষার স্বীকৃতির কার্যকর বাস্তবায়ন।
গত রোববার সরকারি সফরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার যাওয়ার সময় ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ৯ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। নতুন দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হেযবুত তওহীদ’ নিষিদ্ধ করা। হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদীর দাবি, সংগঠনটি ইসলামকে বিকৃত করছে, ফিতনা ছড়াচ্ছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড দেশের জন্য হুমকি।
নতুন দাবির তালিকায় আরও রয়েছে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর, ২০২১ সালে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে সহিংসতা ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার।
তবে এবার নেই ২০১৩ সালের বহুল আলোচিত ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংবিধানে পুনঃস্থাপনের দাবি। হেফাজত নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছে এবং সংসদে বিল পাস হয়েছে বলেই দাবিটি আর রাখা হয়নি। যদিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এখনো সংবিধান সংশোধনের কোনো বিল সংসদে তোলা হয়নি; সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটি কেবল কাজ শুরু করেছে।
২০১৩ সালের ১৩ দফায় ধর্ম অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন বাতিল, কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা, ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করাসহ নানা দাবি ছিল। ৫ মে শাপলা চত্বরের কর্মসূচি ঘিরে সংঘাত, অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে রাজধানীতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে হেফাজত ঘটনাটিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে দাবি করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও হেফাজত ১২ দফা দাবি তুলেছিল। এবার সেই দাবিগুলোর কিছুটা সংশোধন করে ৯ দফা দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের দাবি, শাপলা চত্বরের ঘটনায় জড়িতদের পাশাপাশি ২০২১ ও ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি, নির্দেশদাতা ও হত্যাকারীদেরও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতির বিষয়টিও এবার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০১৭ সালে এর সনদকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেওয়া হলেও হেফাজতের অভিযোগ, কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষায় সেই স্বীকৃতির কার্যকর প্রয়োগ হয়নি। তাই সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় কওমি শিক্ষার্থীদের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
২০১৩ থেকে ২০২ এই দীর্ঘ সময়ে হেফাজতের দাবিতে বারবার ফিরে এসেছে ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা, হেফাজত নেতাদের মামলা প্রত্যাহার এবং টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভী ও তাঁর অনুসারীদের প্রবেশ বন্ধের মতো বিষয়।
ফলে ১৩ থেকে ৯ দাবির সংখ্যা কমলেও হেফাজতের মূল ধর্মীয় অবস্থান খুব বেশি বদলায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধর্মীয় দাবির পাশে এখন বিচার, রাজনৈতিক ঘটনার জবাবদিহি এবং কওমি শিক্ষার স্বীকৃতির বাস্তব প্রয়োগও সংগঠনটির দাবির কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে।
সূত্রঃ প্রথম আলো
