বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর আযান শুনে কয়েকজন অমুসলিম বালক আযান নিয়ে ব্যঙ্গ করে। তারা বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর আযান নকল করে আযান দিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো আযান নিয়ে ঠাট্টা করা।
মক্কা বিজয় শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুনাইনে অভিযান চালান। হুনাইন অভিযান শেষে ফেরার পথে এই ঘটনা ঘটে। বালকরা মক্কার অধিবাসী। রাসূলের সান্নিধ্যে তাদের শৈশব-কৈশোর কাটেনি। ফলে, ইসলাম নিয়ে তাদের জানাশোনা যেমন ছিলো না, তেমনি তারা প্রত্যক্ষ করেছে ইসলাম সম্পর্কে তাদের পিতৃপুরুষদের ঘৃণা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুনতে পেলেন বালকরা আযান নিয়ে ব্যঙ্গ করছে। তবে, একজন ব্যঙ্গ করলেও তার কণ্ঠ ছিলো শ্রুতিমধুর।
রাসূলুল্লাহ বালকদেরকে ডাকলেন। তাদেরকে ধরে আনা হলো। তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্যে একজন মধুর কণ্ঠে আযান দিয়েছো। কে সে?”
বালকরা ধরা পড়ে সত্য কথা বললো। তারা আবু মাহযূরাকে দেখালো। আবু মাহযূরা ব্যঙ্গ করলেও তার কণ্ঠস্বর মুগ্ধ হবার মতো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “এবার আযান দাও।”
আবু মাহযূরা তো মক্কায় ছিলেন। জীবনে এরকম আযান তেমন শুনেননি। হঠাৎ বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আযান দিতে দেখে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করার জন্য শুধু নকল করেছেন। সত্যিকারার্থে তিনি তো আযান দিতে পারেন না।
আবু মাহযূরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, “আমি তো আযান দিতে পারি না।”
বিলাল, আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাখতূম রাদিয়াল্লাহু আনহুমাদেরকে আযান শেখান অন্যান্য সাহাবীরা। রাসূল তাদেরকে আযান শেখাননি।
কিন্তু, অমুসলিম বালক আবু মাহযূরার কন্ঠস্বর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতো মুগ্ধ হোন, তিনি নিজেই আবু মাহযূরাকে আযান শেখান। আবু মাহযূরা রাসূলের কাছে আযান শিখে এবার আযান শুনালেন।
রাসূলুল্লাহ তাকে একটি রূপার থলে দিলেন। থলেটি ছিলো হুনাইন যুদ্ধের গনীমত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সম্পদ দান করে মূলত আবু মাহযূরাকে আকৃষ্ট করতে চান। যাকাতের আটটি খাতের মধ্যে অমুসলিম, নও-মুসলিমকে দান করাও একটি খাত।
তিনি তার মধ্যে যে ট্যালেন্ট দেখতে পান, সেই ট্যালেন্টের কদর করেন। আবু মাহযূরা যখন দেখতে পান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার গুণের কদর করেছেন, তাকে পুরস্কৃত করেছেন, তখন তার মন ইসলামের দিকে ঝুঁকে যায়।
একটু আগে যিনি আযান নিয়ে ব্যঙ্গ করেন, রাসূলের স্বীকৃতি পাবার পর তিনি তাঁর ট্যালেন্ট কাজে লাগাতে চান। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনেক বড়ো একটি প্রস্তাব দেন।
আবু মাহযূরা প্রস্তাব দেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে মক্কায় আযান দেয়ার দায়িত্ব দান করুন। আমাকে মক্কার মুয়াজ্জিন হিশেবে নিয়োগ দান করুন।”
ইসলামের শ্রেষ্ঠ তিন মসজিদের একটি মক্কার মসজিদুল হারাম। আবু মাহযূরা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর প্রতিভা কাজে লাগানোর জন্য সর্বোচ্চ পদের প্রস্তাব দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটা গ্রহণ করেন।
আবু মাহযূরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হোন মক্কার মসজিদুল হারামের মুয়াজ্জিন। একসময় যিনি আযান নিয়ে ব্যঙ্গ করেন, তিনি হোন ইসলামের শ্রেষ্ঠ মসজিদের মুয়াজ্জিন। শুধু তিনি নিজে নন, তার ছেলে, নাতিও ইসলামের শ্রেষ্ঠ মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন।
এই ঘটনা থেকে শিখতে পারি নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ট্যালেন্ট হান্ট। তিনি যখনই কোনো প্রতিভাবান কাউকে দেখেছেন, তার প্রতিভা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। তার ঐ গুণটির জন্য নবিজী তার প্রশংসা করেন, পুরস্কৃত করেন।
ইসলামের সেবা করা তথা দ্বীনের খেদমত করার জন্য তিনি সবাইকে একই পেশা বা একই কর্মে নিয়োজিত করেননি।
হাসসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাব্য প্রতিভা কাজে লাগান, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ব্যবসার জন্য উৎসাহ দান করেন, খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুদ্ধ কৌশল কাজে লাগান তাকে সেনাপতি বানিয়ে।
সীরাত পড়লে দেখা যায়, যে সাহাবী যে কাজে দক্ষ ছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ঐ কাজের মাধ্যমে ইসলামের সেবা করতে উৎসাহ দান করেন।
[Talent Management -এর আলোকে সীরাত পড়া শুরু করলাম। নতুন আঙ্গিকে সীরাত পড়তে এতো চমৎকার লাগছে, অনেক বিখ্যাত ঘটনাগুলো নতুনভাবে চিন্তা করে মজা পাচ্ছি।]
উপরের ঘটনাটির তথ্যসূত্র:
১. সুনানে আন-নাসাঈ: ৬৩২।
২. ইমাম আয-যাহাবী, সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা: ৩/৭৮।
আরিফুল ইসলাম
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২
