Wednesday, September 16, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবর‘দরিয়া-ই-নূর’ নিয়ে দানা বাঁধছে রহস্য

‘দরিয়া-ই-নূর’ নিয়ে দানা বাঁধছে রহস্য

বাংলাদেশের সবচেয়ে অমূল্য রাষ্ট্রীয় রত্ন দরিয়া-ই-নূর ১১৭ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ভল্টে সংরক্ষিত—এমনটাই বলা হয় সরকারি নথিতে। কিন্তু বাস্তবে এই হীরা স্বচক্ষে দেখেছেন—এমন মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা। সবশেষ ১৯৮৫ সালে সোনালী ব্যাংকের ভল্ট খোলা হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার দশক। এই দীর্ঘ সময়ে দরিয়া-ই-নূর ঘিরে জমেছে প্রশ্ন আর রহস্য।

Daria-i-Noor

রাষ্ট্রীয় রত্ন হয়েও দরিয়া-ই-নূর কখনোই জনগণের সামনে আসেনি। নেই কোনো সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক যাচাই, নেই স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো, এমনকি নেই পূর্ণাঙ্গ তালিকাভুক্ত নথি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ভল্টে যা আছে, সেটিই কি সত্যিকারের ঐতিহাসিক দরিয়া-ই-নূর?

এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই গত বছরের ২৯ মে অন্তর্বর্তী সরকার মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। সোনালী ব্যাংকের ভল্টে সংরক্ষিত ঢাকার নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক হীরক খণ্ড দরিয়া-ই-নূরসহ মোট ১০৯ ধরনের রত্নালংকার প্যাকেট খুলে মিলিয়ে দেখার কথা ছিল এই কমিটির। কমিটির কার্যক্রম বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কমিটি ঢাকার নবাব এস্টেটের অস্থাবর সম্পত্তি ‘দরিয়া-ই-নূর’সহ মোট ১০৯ ধরনের রত্নের তালিকা প্রস্তুত করবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো যত্নসহকারে রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশনা দেবে।

কিন্তু সাত মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কমিটির সদস্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত তিনটি বৈঠক হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছিল একটি টিম সরেজমিনে ভল্টের পরিবেশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিক্যামেরা ও আনুষ্ঠানিক ডেলিগেশনের উপস্থিতিতে পরিদর্শন করবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। নির্ধারিত টিম ভল্টে যায়নি, পরিদর্শন হঠাৎ বাতিল করা হয়। কেন বাতিল হলো, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। শুধু বলা হয়েছিল, পরে নতুন তারিখ দেওয়া হবে। সেই ‘নতুন তারিখ’ আর আসেনি। পরিদর্শন বাতিলের পর কমিটির আর কোনো বৈঠকও হয়নি।

কমিটির অন্যতম সদস্য ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন নাগরি মূল কাজ করছেন বলেও জানান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান। কমিটির কাজের অগ্রগতি জানতে সালাহউদ্দিন নাগরিকে একাধিকবার বার্তা দিলেও সাড়া মেলেনি।

দরিয়া-ই-নূর ফার্সি শব্দ, যার অর্থ ‘আলোর সাগর’ বা ‘আলোর নদী’। হীরাটি গোলাপি আভাযুক্ত, টেবিল-কাট বা কার্নিসযুক্ত আয়তকার। ওজন প্রায় ১৮২ ক্যারেট (কিছু বর্ণনায় ২৬ ক্যারেট মূল হীরক ও সংযুক্ত ১০টি ছোট হীরকসহ মোট ৭৬ ক্যারেট)। কোহিনূরের মতোই এটি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের কল্লুর/গোলকুণ্ডা খনি থেকে পাওয়া যায় বলে ধারণা করা হয়। একটি স্বর্ণের বাজুবন্দের মধ্যখানে মূল হীরকটি বসানো ছিল, চারপাশে আরো ১০টি ডিম্বাকৃতির হীরক সংযুক্ত ছিল।

ভূমি সংস্কার বোর্ডের ‘কোর্ট অব ওয়ার্ডস : ঢাকা নবাব স্টেটের ইনডেনচার’-সংক্রান্ত নথিপত্র অনুযায়ী এই ১০৯ ধরনের রত্নের মধ্যে রয়েছে হীরক খণ্ড দরিয়া-ই-নূর। এরপরই রয়েছে একটি হীরার তারা, যাতে ৯৬টি মুক্তা বসানো আছে এবং যা একসময় ফ্রান্সের সম্রাজ্ঞীর মালিকানাধীন ছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

হীরার তারার পর তালিকায় রয়েছে পান্না পাথর খোদাই করা হীরার বাজুবন্ধ। এরপর আছে রুবি পাথর ও হীরার তৈরি একটি মাথার অলংকার, যা ‘রোজ অব করসিকা’ নামে পরিচিত। প্যাকেটে আরো থাকার কথা মুক্তা ও হীরার তৈরি একটি ফেজ টুপি, যার সঙ্গে ঝুলন্ত মুক্তা ও পান্না সংযুক্ত রয়েছে। এছাড়া পান্না ও হীরাখচিত একটি সোনার বেল্ট এবং পাগড়িতে পরার উপযোগী হীরা ও পান্না দিয়ে তৈরি অলংকারের কথাও নথিতে উল্লেখ আছে।

নথিপত্রে বলা হয়েছে, প্যাকেটে থাকা অধিকাংশ অলংকারই হীরা বা পান্না দিয়ে নির্মিত। এর মধ্যে একটি হীরাখচিত তরবারির উল্লেখও রয়েছে। সবচেয়ে কম মূল্যমানের বস্তু হিসেবে উল্লেখ আছে বাদ্যযন্ত্র ম্যান্ডলিনের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। এ ছাড়া আংটি, হার, হাতবন্ধনী ও বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান পাথরখচিত অলংকারও ওই প্যাকেটে থাকার কথা নথিতে বলা হয়েছে।

শেষ দেখা ১৯৮৫, তারপর ‘রহস্যজনক’ নীরবতা

সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৯৮৫ সালে শেষবার সোনালী ব্যাংকের ভল্ট খুলে দরিয়া-ই-নূর যাচাই করা হয়। কিন্তু সেই যাচাইয়ের কোনো আলোকচিত্র নেই, নেই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। তৎকালীন দায়িত্বশীলদের অনেকেই এখন আর জীবিত নন বা দায়িত্বে নেই। বর্তমান কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশই স্বীকার করেন, তারা কখনো এই হীরা দেখেননি। ফলে হীরার অবস্থান, অবস্থা কিংবা পরিচয়—সবই নির্ভর করছে পুরোনো নথি আর মৌখিক দাবির ওপর।

বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের অভাব

রাষ্ট্রীয় রত্ন হিসেবে পরিচিত হলেও দরিয়া-ই-নূরের কোনো আধুনিক জেমোলজিক্যাল পরীক্ষা হয়নি। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ক্যারেট, কাটিং, বিশুদ্ধতা বা সার্টিফিকেশন-সংক্রান্ত কোনো সাম্প্রতিক নথি নেই। যে হীরার মূল্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে এত দাবি, তার বৈজ্ঞানিক পরিচয়ই যদি অপ্রমাণিত থাকে, তাহলে রাষ্ট্রীয় রত্ন হিসেবে সেই দাবির ভিত্তি কতটা শক্ত—সে প্রশ্ন এড়ানো যায় না।

দরিয়া-ই-নূর নিয়ে বিভ্রান্তি

দরিয়া-ই-নূর নামটি ইতিহাসজুড়ে বিভ্রান্তির উৎস। সবচেয়ে বড় দরিয়া-ই-নূর হলো ১৮২ ক্যারেটের গোলাপি হীরা, যা বর্তমানে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত। বাংলার দরিয়া-ই-নূর ২৬ ক্যারেটের টেবিল-কাট হীরা, যা পাঞ্জাবের মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের সংগ্রহে ছিল বলে ধারণা করা হয়। নামের খ্যাতি কাজে লাগিয়ে ১৮ ও ১৯ শতকে একাধিক হীরাকে দরিয়া-ই-নূর নামে পরিচিত করা হয়, ফলে তৈরি হয় বিভ্রান্তি।

হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির নথি অনুযায়ী, বাংলার দরিয়া-ই-নূরের সঙ্গে নাদির শাহের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্কের উল্লেখ নেই। তাদের বর্ণনায় হীরাটি মারাঠা রাজাদের হাত ঘুরে হায়দরাবাদের নবাব সিরাজ-উল-মুলকের পরিবারে আসে, সেখান থেকে মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের কাছে পৌঁছে এবং পরে ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়।

স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত একটি বাজুবন্ধ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। নকশা, জয়পুরী মিনাকারী কাজ, রূপার বেজ ও মেরুন রঙের সিল্ক তাগা—সবই দরিয়া-ই-নূরের ঐতিহাসিক বাজুবন্ধের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়। তবে সেখানে বসানো রয়েছে ক্রিস্টাল কোয়ার্টজ, হীরা নয়। মিউজিয়ামের তথ্যমতে, এটি লাহোরের তোশাখানা থেকে আগত এবং ১৯১১ সালে স্কটল্যান্ডে পৌঁছায়—যে বছর দরিয়া-ই-নূর আবার ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল। এটি কি রেপ্লিকা, নাকি ইতিহাসের কোনো অজানা অধ্যায়—তার কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নেই।

লাহোর থেকে ঢাকা : দীর্ঘ যাত্রা

১৮৪১ সালে আঁকা রাজা শের সিংয়ের ছবিতে তার বাম হাতে দরিয়া-ই-নূরের বাজুবন্ধ দেখা যায়। ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব ব্রিটিশদের দখলে গেলে হীরাটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে যায়। ১৮৫১ সালে লন্ডনের গ্রেট এক্সিবিশনে কোহিনুরের পাশাপাশি দরিয়া-ই-নূর প্রদর্শিত হলেও এর চ্যাপ্টা কাটিংয়ের কারণে ব্রিটিশদের পছন্দ হয়নি। ফলে রানি ভিক্টোরিয়া কোহিনুর রাখলেও দরিয়া-ই-নূর ভারতে ফেরত পাঠান।

১৮৫২ সালের নভেম্বরে হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির নিলামে ঢাকার নবাব খাজা আলীমুল্লাহ ৭৫ হাজার টাকায় এটি কিনে নেন। এরপর থেকে এটি ঢাকার নবাব পরিবারের অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

বন্ধক, ঋণ ও ভল্টের অন্ধকার

১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ আর্থিক সংকটে পড়ে পূর্ববঙ্গ ও আসাম সরকার থেকে ১৪ লাখ রুপি ঋণ নেন। তখন দরিয়া-ই-নূরসহ রত্নসমৃদ্ধ অলংকার বন্ধক রাখা হয়। ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় ওই সম্পত্তি সরকারি তত্ত্বাবধানে চলে আসে।

১৯১১ সালে ঋণ শোধের আশায় হীরাটি আবার ইংল্যান্ডে পাঠানো হলেও সর্বোচ্চ এক হাজার ৫০০ পাউন্ড দাম ওঠে। পরে হীরাটি ফেরত আনা হয় এবং ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির তত্ত্বাবধানে থাকে। ১৯৪৯ সালে এটি ঢাকায় এনে প্রথমে ইম্পেরিয়াল ব্যাংক, পরে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্বাধীনতার পর সোনালী ব্যাংকের ভল্টে রাখা হয়।

বারবার কমিটি হলেও নেই অগ্রগতি

দরিয়া-ই-নূর নিয়ে এটাই প্রথম কমিটি নয়। ২০০৩ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল, যার কার্যক্রমের কোনো তথ্য নেই। ২০১১ সালে সিলগালা লোহার বাক্স আনা হলেও তা খোলা হয়নি। ২০১৬ ও ২০২২ সালে সংসদীয় কমিটিতে উদ্বেগ প্রকাশ ও ভল্ট খোলার প্রস্তাব এলেও বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের ১১ সদস্যের কমিটিও এখন কার্যত স্থবির। দরিয়া-ই-নূর হেফাজতের দায়িত্বে রয়েছে সোনালী ব্যাংক, ভূমি সংস্কার বোর্ড ও ভূমি মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রকৃত দায় কার—তা স্পষ্ট নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

nineteen − five =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য